শনিবার১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মুক্ত তথ্য - The Daily Muktotathya
বিজ্ঞাপন/গুরুত্বপূর্ণ ইনফরমেশন
প্রচ্ছদ/আমেরিকা/ইরান যুদ্ধে আমেরিকার ব্যয় ৩৮ বিলিয়ন ডলার, আরও যত সংকটের পূর্বাভাস
আমেরিকা

ইরান যুদ্ধে আমেরিকার ব্যয় ৩৮ বিলিয়ন ডলার, আরও যত সংকটের পূর্বাভাস

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ছয় মাসব্যাপী সামরিক অভিযানে এ পর্যন্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৮ বিলিয়ন (৩ হাজার ৮০০ কোটি) মার্কিন ডলারে।

প্রকাশিত: ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ০৮:৩১ AM26 বার পঠিত
ইরান যুদ্ধে আমেরিকার ব্যয় ৩৮ বিলিয়ন ডলার, আরও যত সংকটের পূর্বাভাস
সংবাদটি শেয়ার করুন:

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ছয় মাসব্যাপী সামরিক অভিযানে এ পর্যন্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৮ বিলিয়ন (৩ হাজার ৮০০ কোটি) মার্কিন ডলারে। শুধু তা-ই নয়, এই যুদ্ধে প্রতি মাসে নতুন করে আরও ৩ বিলিয়ন ডলার করে খরচ বাড়বে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে মার্কিন কংগ্রেসের নিরপেক্ষ আর্থিক হিসাবরক্ষণ সংস্থা দ্য কংগ্রেসনাল বাজেট অফিস (সিবিও)।

ট্রাম্প প্রশাসন যখন এই সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান রুট হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করার পথ খুঁজছে, ঠিক তখনই সিবিও-এর পক্ষ থেকে এই আশঙ্কাজনক তথ্য সামনে আনা হলো। বাজেট অফিসের নতুন এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুদ্ধে বিপুল খরচের কারণে ২০২৭ সালের প্রথম তিন মাসে মার্কিন অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির হার শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

দীর্ঘায়িত এই যুদ্ধের কারণে মার্কিন সামরিক বাহিনীর গোলাবারুদ ও আধুনিক অস্ত্রাগারে টান পড়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া অন্য যেকোনো সম্ভাব্য সংঘাত বা সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের তাৎক্ষণিক সক্ষমতা নিয়ে মারাত্মক প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে দেশটির এমনিতেই চাপে থাকা কেন্দ্রীয় বাজেটে এ ব্যয় অতিরিক্ত বোঝা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

এর আগে, গত ২১ জুলাই মার্কিন সিনেটে এক শুনানিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ যুদ্ধে ৩৭.৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের যে হিসাব দিয়েছিলেন, সিবিও-এর প্রকাশিত চূড়ান্ত তথ্য তার খুব কাছাকাছি। সিবিও জানিয়েছে, খরচের বড় একটি অংশ গেছে মার্কিন অস্ত্রাগার থেকে অতি দ্রুত গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের কারণে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের খালি হয়ে যাওয়া এই বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের মজুত পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে অন্তত পাঁচ বছর সময় লেগে যেতে পারে। এ ছাড়া গত আগস্ট মাসে প্রকাশিত রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র তার মজুতে থাকা প্রায় সমস্ত দূরপাল্লার নিখুঁত লক্ষ্যভেদী (লং-রেঞ্জ প্রিসিশন) ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ফেলেছে।

উদ্বেগজনক এই আর্থিক পর্যালোচনার ক্ষেত্রে মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর বা পেন্টাগন কংগ্রেসের অর্থ নিরীক্ষকদের কোনো ধরনের সহযোগিতা করেনি বলে অভিযোগ করেছে সিবিও। তবে এ বিষয়ে সুর চড়িয়েছে হোয়াইট হাউস। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান আক্রমণকে একটি ‘দৃঢ় ও সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, মার্কিন কর্মী ও স্বার্থের ওপর যেন তেহরান কোনো আঘাত হানতে না পারে, সে জন্যই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এক বিবৃতিতে তিনি আরও দাবি করেন, মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাছে এমন পর্যাপ্ত পরিমাণ গোলাবারুদ, অস্ত্র ও রসদ মজুত রয়েছে যা দিয়ে কমান্ডার-ইন-চিফ বা প্রেসিডেন্টের সমস্ত কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের পাশাপাশি আরও বড় সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব।

পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেলও সিবিও-এর অস্ত্র ঘাটতির তথ্যটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, প্রেসিডেন্টের পছন্দ অনুযায়ী যেকোনো সময়ে এবং যেকোনো স্থানে আঘাত হানার জন্য যা যা প্রয়োজন, তার সবই আমাদের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে রয়েছে।

মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের বাজেট কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য ব্রেন্ডন বয়েলের অনুরোধে এই ব্যয়সংক্রান্ত তদন্ত ও পর্যালোচনাটি পরিচালনা করা হয়েছিল। সিবিও-এর রিপোর্ট সামনে আসার পর ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর সমালোচনা করে পেনসিলভানিয়ার এই ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি বলেন, ইরানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিপর্যয়কর যুদ্ধ ইতিমধ্যে আমাদের বহু বীর মার্কিন সেনাসদস্যের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এবং অনেককে আহত করেছে। এই মানবীয় ক্ষতির বাইরেও, দলনিরপেক্ষ সিবিও রিপোর্টে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে এই যুদ্ধ মার্কিন করদাতাদের দশ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ শেষ করেছে এবং এই খরচের খাত দিন দিন আরও বড় হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।

উল্লেখ্য, এখন পর্যন্ত ইরান যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ১৮ জন সদস্য নিহত হয়েছেন।

সিবিও জানিয়েছে, তাদের এই প্রতিবেদনে সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে আঘাত হানার ফলে হওয়া ক্ষতির হিসাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এমনকি যুদ্ধ পরিচালনা করার জন্য গৃহীত ঋণের সুদের যে অতিরিক্ত খরচ, যা ভবিষ্যতে মূল খরচের সঙ্গে আরও ১০ বিলিয়ন ডলার যোগ করতে পারে, তা-ও এই খতিয়ানে ধরা হয়নি। ফলে প্রকৃতপক্ষে মার্কিন কোষাগারের ওপর চাপের পরিমাণ অনেক বেশি।

প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মার্কিন সামরিক প্রস্তুতকামী ও সার্বিক অর্থনীতির ওপর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতকারী ব্যবস্থাসহ (মিসাইল ইন্টারসেপ্টর) অতি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রশস্ত্রের ঘাটতি ভবিষ্যতে অন্য কোনো বড় সংঘাত—যেমন চীন ও তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলে পেন্টাগনের সামরিক সাড়াদানের সক্ষমতাকে গুরুতরভাবে ঝুঁকিতে ফেলবে।

সিবিও-এর তথ্যের সত্যতা মেলে জুলাই মাসে সিনেটের শুনানিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথের আকুতিতেও। তিনি অস্ত্রাগার পুনরায় পূর্ণ করতে প্রায় ৯০ বিলিয়ন ডলারের জরুরি তহবিলের আবেদন জানিয়ে বলেছিলেন, এই তহবিল না পেলে আমাদের চরম ও সংকটজনক অস্ত্র ঘাটতির মুখোমুখি হতে হবে।

অন্যদিকে, পেন্টাগনের ইনস্পেক্টর জেনারেলের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান সরাসরি আঘাত হেনে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির শত শত ভবন ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। একই সঙ্গে মার্কিন যুদ্ধবিমান, রিফুয়েলিং বিমান এবং ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে। গত ১৯ জুন পর্যন্ত যুদ্ধের খরচের হিসেবে এই সংস্থাটি ৩৩.৪ বিলিয়ন ডলারের খতিয়ান দেয়, যার মধ্যে ইরানি হামলায় মার্কিন কূটনৈতিক কেন্দ্রগুলোর ১৮৪ মিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতি অন্তর্ভুক্ত ছিল। যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হতো যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে, সেখানে ও পারস্য উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর জ্বালানিকেন্দ্রে হামলার ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে, যা সাধারণ ভোক্তা ও বৈশ্বিক উৎপাদকদের খরচ অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। আগস্ট মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় ঋণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পর এই যুদ্ধব্যয় আমেরিকার ভঙ্গুর রাজস্ব পরিস্থিতিকে আরও পর্যুদস্ত করছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্য ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর ইরাক ও আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের চালানো দীর্ঘ অভিযানের সঙ্গে বর্তমান ইরান যুদ্ধের তুলনা করে এটিকে সংক্ষিপ্ত ও সাশ্রয়ী প্রমাণ করার চেষ্টা নিয়মিত করে থাকেন। তৎকালীন ইরাক যুদ্ধে লক্ষাধিক পদাতিক সৈন্য অংশ নিয়েছিল এবং আট বছরের সেই যুদ্ধে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছিল। অন্যদিকে, আফগানিস্তানে দীর্ঘ দুই দশকের যুদ্ধে, যেখানে তীব্রতম সময়ে এক লাখেরও বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছিল প্রায় ২.৩ ট্রিলিয়ন ডলার। সেই তুলনায় ট্রাম্প প্রশাসন ইরান যুদ্ধকে কম খরচের দাবি করলেও সিবিও-এর হিসাব বলছে, পরিস্থিতি দ্রুতই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।

সূত্র: রয়টার্স