২৪ ঘণ্টায় ২৬ হামলা সৌদির, পাল্টা লড়াইয়ে উত্তপ্ত ইয়েমেন
ইয়েমেনে সৌদি আরব ও ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। হুতিদের দাবি, গত ২৪ ঘণ্টায় ইয়েমেনে তাদের নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন এলাকায় সৌদি আরব ২৬টি বিমান হামলা চালিয়েছে।

আন্তর্জাতি ডেস্ক
ইয়েমেনে সৌদি আরব ও ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। হুতিদের দাবি, গত ২৪ ঘণ্টায় ইয়েমেনে তাদের নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন এলাকায় সৌদি আরব ২৬টি বিমান হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে পাল্টাপাল্টি হামলায় নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে দেশটিতে। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার হুতিরা দাবি করে, গত এক সপ্তাহে তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে সৌদি বাহিনী প্রায় ৩০০টি হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় হুতিদের অবস্থানসহ বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে দাবি করেছে গোষ্ঠীটি। এর আগে শুক্রবার সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের পক্ষ থেকেও হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের তথ্য জানানো হয়। সরকারি বাহিনীর দাবি, তাইজ প্রদেশের আল-ওয়াজিয়াহ জেলায় সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন হুতি যোদ্ধা নিহত এবং ৬০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। ইয়েমেনে যেসব এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে লড়াই তীব্র হয়েছে, আল-ওয়াজিয়াহ তার অন্যতম।
সানায় হুতিদের সমর্থনে বড় সমাবেশ সংঘাতের মধ্যেই শুক্রবার ইয়েমেনের রাজধানী সানায় হুতিদের সমর্থনে বড় ধরনের বিক্ষোভ ও সমাবেশ হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ এতে অংশ নিয়ে হুতিদের প্রতি সমর্থন জানায় এবং সৌদি আরবের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়। সাম্প্রতিক সময়ে হুতিরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করেছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালির আশপাশের এলাকাও তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হিসেবে পরিচিত এই প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী ও হুতিদের মধ্যে নতুন করে সংঘাত বৃদ্ধির ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগও বাড়ছে।
প্রাণহানিও বাড়ছে চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী ও হুতিদের মধ্যে তীব্র লড়াইয়ে অন্তত পাঁচজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। নিহতদের মধ্যে তিনটি শিশুও ছিল বলে উভয় পক্ষের বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। সৌদি আরবের দাবি, হুতিদের একটি ড্রোন প্রতিহত করার পর তায়েফ গভর্নরেটে একজন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে হুতিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, তাইজ ও আবস শহরে সৌদি বিমান হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। তবে সংঘর্ষে হতাহত ও হামলার সংখ্যা নিয়ে দুই পক্ষের দাবির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। স্বাধীনভাবে সব দাবি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সংঘাতে যুক্ত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা যুক্তরাষ্ট্রকেও পরিস্থিতির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করেছে। তবে ওয়াশিংটন এখনও সরাসরি হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানো থেকে বিরত রয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, হুতিদের সাম্প্রতিক দ্রুত ভূখণ্ড দখল এবং বাব আল-মানদেব প্রণালিতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগের পর গত সপ্তাহান্তে ওমানের রাজধানী মাসকাটে মার্কিন দূতাবাসে হুতি প্রতিনিধিদের সঙ্গে মার্কিন কর্মকর্তাদের বৈঠক হয়। বৈঠকে হুতিরা যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করেছে বলে জানা গেছে যে, সৌদি আরবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়—এমন বাণিজ্যিক জাহাজ তাদের হামলার লক্ষ্য হবে না।
সৌদি আরব এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তাতে সাড়া দেয়নি। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে চলমান ব্যয়বহুল যুদ্ধের মধ্যে ইয়েমেনে নতুন একটি সামরিক ফ্রন্ট খোলার ঝুঁকি নিতে ওয়াশিংটন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
লোহিত সাগরে সতর্কতা বাড়াল ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইয়েমেনে সংঘাত বৃদ্ধির প্রভাব লোহিত সাগর ও আশপাশের নৌপথেও পড়ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস শুক্রবার জানান, আঞ্চলিক পরিস্থিতির অবনতির কারণে লোহিত সাগরে ইইউর নৌ মিশন ‘অপারেশন অ্যাসপিডেস’-এর সতর্কতার মাত্রা বাড়ানো হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে কালাস বলেন, সৌদি আরবের ওপর হুতিদের হামলা ‘গ্রহণযোগ্য নয়’ এবং এসব হামলা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তিনি জানান, ইয়েমেনে যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়ে তিনি সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। বাব আল-মানদেব ও লোহিত সাগর দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে। ফলে ইয়েমেনের সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে এর প্রভাব আঞ্চলিক নিরাপত্তার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের ওপরও পড়তে পারে। সূত্র: আল-জাজিরা





