শিয়ালের মাংস, তক্ষক কিংবা জোঁকের তেলে সত্যিই কী রোগ সারে?
শিয়ালের মাংস খেলে বাতের ব্যথা সারে, তক্ষক খেলে নাকি যৌনক্ষমতা বাড়ে, এমনকি ক্যানসারের মতো দুরারোগ্য রোগও ভালো হয়! আবার জোঁকের তেল দিয়ে বাত, কোমর ও জয়েন্টের ব্যথা নিরাময়ের দাবি করেন অনেকে।

মুক্ততথ্য ডেস্ক
শিয়ালের মাংস খেলে বাতের ব্যথা সারে, তক্ষক খেলে নাকি যৌনক্ষমতা বাড়ে, এমনকি ক্যানসারের মতো দুরারোগ্য রোগও ভালো হয়! আবার জোঁকের তেল দিয়ে বাত, কোমর ও জয়েন্টের ব্যথা নিরাময়ের দাবি করেন অনেকে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত এসব লোকবিশ্বাসের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কতটা? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব দাবির বেশির ভাগেরই নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
শিয়ালের মাংসে কি সত্যিই রোগ সারে? দেশের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে শিয়ালকে ঘিরে নানা ধরনের কুসংস্কার প্রচলিত রয়েছে। কেউ শিয়ালকে অশুভ প্রাণী মনে করেন, আবার কেউ মনে করেন এর মাংস খেলে হাঁপানি, বাতসহ দীর্ঘস্থায়ী বিভিন্ন রোগ ভালো হয়। এমন বিশ্বাস থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় শিয়াল হত্যার ঘটনাও ঘটছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. মনিরুল এইচ খান বিবিসিকে জানিয়েছেন, শিয়ালের মাংসে কোনো ঔষধি গুণ নেই। এটি খেলে অসুস্থতা ভালো হয়—এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি ও ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মুহিতও বলেছেন, শিয়ালের মাংস খেলে রোগবালাই সারে—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। আধুনিক ফার্মাকোলজিতেও এ ধরনের তথ্য পাওয়া যায় না।
তক্ষকের দাম কোটি টাকা, নাকি প্রতারণার ফাঁদ? তক্ষককে ঘিরেও দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের গুজব ও প্রতারণা চলে আসছে। ক্যানসারসহ দুরারোগ্য রোগ নিরাময় এবং যৌনক্ষমতা বৃদ্ধির মতো কথিত ঔষধি গুণের কথা বলে এই প্রাণীটির দাম কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়। এমনকি সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা হাতিয়ে নেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। তবে তক্ষকের এসব কথিত ঔষধি গুণের পক্ষে নির্ভরযোগ্য কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং কোটি টাকায় বিক্রির গুজবকে কেন্দ্র করে প্রতারণার পাশাপাশি বন্য পরিবেশ থেকে তক্ষক ধরার প্রবণতা বেড়েছে।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, চীন, তাইওয়ান ও ভিয়েতনামসহ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাচারের কারণে বাংলাদেশে তক্ষকের সংখ্যা কমেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মনিরুল এইচ খান বলেন, তক্ষক নিয়ে একটি প্রতারণার চক্র তৈরি হয়েছে। গত সাত-আট বছর ধরে এ ধরনের গুজব চলছে। তবে আগে মানুষ বেশি তক্ষক ধরলেও এখন সেই প্রবণতা কিছুটা কমেছে।
জোঁকের তেল কি বাত ও ব্যথা সারায়? শিয়ালের মাংস ও তক্ষকের ঔষধি গুণ নিয়ে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ না থাকলেও চিকিৎসায় জোঁকের ব্যবহার একেবারে নতুন নয়। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন ইউনানি চিকিৎসাপদ্ধতিতে জীবন্ত জোঁক ব্যবহার করে চিকিৎসার প্রচলন রয়েছে। বিশেষ ক্ষেত্রে মেডিকেটেড জোঁক দিয়ে শরীরের নির্দিষ্ট স্থানের জমাট বাঁধা রক্ত অপসারণে লিচ থেরাপি ব্যবহার করা হয়।
হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের আয়ুর্বেদিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. মনির আহাম্মেদ জানান, সব ধরনের জোঁক চিকিৎসায় ব্যবহার করা যায় না। এ জন্য নির্দিষ্ট প্রজাতির মেডিকেটেড জোঁক প্রয়োজন। তবে বাজারে প্রচলিত জোঁকের তেল দিয়ে বাত, জয়েন্টের ব্যথা, কোমরব্যথা কিংবা যৌনসমস্যা নিরাময়ের দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক তথ্য নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মুহিতের মতে, জোঁকের তেলের কোনো প্রমাণিত ঔষধি গুণাগুণ নেই।
শিয়াল ও তক্ষক শিকার করলে কী শাস্তি হতে পারে? বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে শিয়াল ও তক্ষককে সংরক্ষিত প্রাণী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট অনুমতি বা লাইসেন্স ছাড়া এসব প্রাণী শিকার, ধরা, পরিবহণ, ক্রয়-বিক্রয় কিংবা রপ্তানি করা যায় না। বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের কর্মকর্তা রথীন্দ্র কুমার বিশ্বাস বলেন, শিয়াল ও তক্ষক নিয়ে মানুষের মধ্যে নানা কুসংস্কার রয়েছে। তক্ষকের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য নিয়েও প্রচলিত ধারণার বাস্তব ভিত্তি নেই। আইনের ব্যত্যয় ঘটলে বন বিভাগ, পুলিশ, কাস্টমস, নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ড প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে।
আইইউসিএন বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের রেড লিস্টে খেঁকশিয়ালকে ঝুঁকিপূর্ণ এবং তক্ষককে তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে থাকা প্রাণী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। ২০২৬ সালের মূল্যায়নেও তক্ষককে ‘লিস্ট কনসার্ন’ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। তবে বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে প্রকৃতি থেকে তক্ষক সংগ্রহের বিষয়টি উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা।
তথ্যসূত্র: বিবিসি





