সামুদ্রিক সুরক্ষার প্রভাব নিয়ে প্রায় ২০০ বিজ্ঞানীর বিস্তৃত পরিসরে গবেষণা
আটলান্টিক মহাসাগরের কোলে অবস্থিত মাদেইরা দ্বীপপুঞ্জের সামুদ্রিক পরিবেশে বিশাল বৈজ্ঞানিক অভিযান শুরু হয়েছে। এই গবেষণায় সমুদ্রের স্বাস্থ্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্যের সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সমুদ্রকে বাঁচাতে আন্তর্জাতিক পরিসরে এক যৌথ উদ্যোগ গড়ে উঠেছে।

মুক্ততথ্য ডেস্ক
আটলান্টিক মহাসাগরের কোলে অবস্থিত মাদেইরা দ্বীপপুঞ্জের সামুদ্রিক পরিবেশে বিশাল বৈজ্ঞানিক অভিযান শুরু হয়েছে। এই গবেষণায় সমুদ্রের স্বাস্থ্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্যের সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সমুদ্রকে বাঁচাতে আন্তর্জাতিক পরিসরে এক যৌথ উদ্যোগ গড়ে উঠেছে। প্রায় ২০০ গবেষক ও বিজ্ঞানী ১৫টি জাহাজে চড়ে মাদেইরার অন্তর্গত 'দেসারতাস' দ্বীপপুঞ্জের আশেপাশের সামুদ্রিক অঞ্চল জরিপ করছেন। তারা পর্যবেক্ষণ করছেন, বছরের পর বছর নির্দিষ্ট এলাকায় মাছ ধরা বন্ধ রাখলে বা সামুদ্রিক সুরক্ষা জোরদার করলে মহাসাগরের জীববৈচিত্র্যে কী ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসে।
অভিযানে দেখা গেছে, দেসারতাস দ্বীপপুঞ্জের তলদেশে এক মনোরম পরিবেশে স্বচ্ছ জলের মধ্য দিয়ে ডানা মেলে সাঁতরে চলেছে বিশালাকার এক রে মাছ। পানির নিচের সেই ভিডিও ও চিত্রমালা মনোযোগ দিয়ে বিশ্লেষণ করছেন গবেষকরা। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের 'প্রিস্টিন সিজ' উদ্যোগের সদস্য এবং কলম্বিয়ান সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী হুয়ান মায়োরগা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, আমরা যখন এই ধরনের প্রাণীদের দেখতে পাই, তখন বুঝতে হবে দিনটি আমাদের জন্য সত্যিই দারুণ! মায়োরগা দীর্ঘ দিন ধরে পানির নিচের ছবি ও ফুটেজ পরীক্ষা করে দেখছেন, যাতে সামুদ্রিক সুরক্ষার প্রকৃত প্রভাব পরিমাপ করা যায়। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, বছর পর বছর ধরে আমরা যখন এই জায়গাটিকে সুরক্ষা দিই, তখন মাছগুলো আকারে আরও বড় হয় এবং ক্রমশ বিপুল পরিমাণ বংশবৃদ্ধি করতে থাকে। এর থেকে সুস্পষ্ট বোঝা যায় যে, সামুদ্রিক সুরক্ষা ব্যবস্থা সত্যিই কাজ করছে।
দেশ-বিদেশের গবেষকদের নিয়ে আসা এই অভিযানের মূল ফ্ল্যাগশিপ জাহাজ হিসেবে কাজ করছে ৭০ মিটার দীর্ঘ বিশেষ পালের জাহাজ 'সান্টা মারিয়া মানুয়েলা'। মাদেইরা থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত তিনটি নির্জন ও পাহাড়ি ছোট দ্বীপের সমষ্টি হলো এই দেসারতাস দ্বীপপুঞ্জ। সান্টা মারিয়া মানুয়েলা এবং অন্যান্য গবেষণা জাহাজে চড়ে গবেষক দলটি একটি বিশেষ বৈজ্ঞানিক কৌশল ব্যবহার করছেন। তারা মেটালের ফ্রেম বা ধাতব কাঠামোতে টোপসহ পানির নিচে সচল ক্যামেরা সেট করে ৪০ থেকে ৫০ মিটার গভীরে নামিয়ে দিচ্ছেন। এই টোপের লোভে মাছ যখন কাছে আসে, তখন সেগুলোর বিরল দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী হয়।
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান্তা বারবারার মেরিন সাইন্স ইনস্টিটিউটের গবেষক জেনিফার ক্যাসেল এই গবেষণার কার্যপ্রণালী ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জানান যে, তারা মূল দুটি এলাকার মধ্যে সরাসরি তুলনা করতে চান। দেসারতাস দ্বীপপুঞ্জের দক্ষিণ দিকটি এমন এক সংরক্ষিত এলাকা যেখানে মাছ ধরা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। অন্যদিকে উত্তর দিকটির কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলে এখনো নিয়ন্ত্রিতভাবে মাছ ধরার অনুমতি রয়েছে। জেনিফার ক্যাসেল বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে বলেন, আমরা এই সংরক্ষিত সামুদ্রিক অঞ্চলগুলোতে ক্যামেরা বসাব এবং তারপর মাছ ধরার অনুমতি থাকা এলাকাগুলোতেও তা স্থাপন করে দুটি ভিন্ন অঞ্চলের পরিস্থিতি বিশদভাবে তুলনা করে দেখব।
তবে বিজ্ঞানীদের এই গভীর অনুসন্ধান কেবল ক্যামেরার ফুটেজ দেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। ছবি তোলার পাশাপাশি সমুদ্রের তলদেশ ও ওপরের স্তরের পানির নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। পানির মধ্যে জমে থাকা মাছের বিশেষ ডিএনএ চিহ্ন বিশ্লেষণ করে তারা দেখতে চান, কোনো নির্দিষ্ট প্রজাতির মাছ যদি কোনো কারণে ক্যামেরাকে ফাঁকি দিয়ে পিছলে চলে যায়, পানির নমুনাই তাদের উপস্থিতির কথা স্পষ্ট করে দেবে। এর বাইরে সমুদ্রের উপকূলীয় জলবায়ুর তাপমাত্রা মাপতেও কাজ করছেন তারা। দেসারতাস দ্বীপপুঞ্জের জোয়ার-ভাটার মধ্যবর্তী অঞ্চলের শিলা ও পাথরের উষ্ণতা পরিমাপ করা হচ্ছে, যাতে বোঝা যায় চরম তাপ কীভাবে সামুদ্রিক প্রাণীদের প্রভাবিত করে এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে ভবিষ্যতে এখানকার জীববৈচিত্র্য কীভাবে বদলে যেতে পারে।
গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রতিক্রিয়ায় সমুদ্রের জীব কীভাবে খাপ খাইয়ে নেয়, তা বোঝার জন্য পোর্তো বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৪ বছর বয়সী গবেষক রুই সেয়াব্রা এক অনন্য গবেষণা চালাচ্ছেন। কম জোয়ারের সময় সাগরের পানিতে জেগে ওঠা ছোট খাড়ির পাথরে বিশেষ টেম্পারেচার সেন্সর বা তাপমাত্রা মাপক যন্ত্র যুক্ত করছেন তিনি। এতে জানা যাবে রোদে থাকা এবং ছায়ায় থাকা পাথরের সংস্পর্শে এসে ক্রাস্টাসিয়ান (কঠিন খোলসযুক্ত প্রাণী) ও স্পঞ্জ জাতীয় প্রাণীগুলো কীভাবে তাদের আচরণ পরিবর্তন করে। রুই সেয়াব্রা এর ব্যাখ্যায় বলেন, আমাদের বোঝা দরকার যে ভবিষ্যতে জীববৈচিত্র্য কীভাবে স্থানান্তরিত বা পুনর্বিন্যাস হবে, কোন কোন প্রজাতি কোথায় পরিযায়ী হয়ে যাবে, বর্তমানে এখানকার পরিবেশগত অবস্থা কেমন আছে, ভবিষ্যতে তা কতটা পরিবর্তিত হতে পারে এবং আগামী দিনে আমরা এখানে কী ধরনের প্রজাতি খুঁজে পাওয়ার আশা করতে পারি।
আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও পরিবেশ বিষয়ক আলোচনার টেবিলে মহাসাগরের বাস্তুতন্ত্র রক্ষার বিষয়টি যখন শীর্ষ এজেন্ডায় পরিণত হয়েছে, ঠিক তখনই এই বিরাট অভিযানটি পরিচালিত হচ্ছে। গবেষণার মূল নেতা এবং ওশেনো আজুল ফাউন্ডেশনের বৈজ্ঞানিক পরিচালক ইমানুয়েল গন্সালভেস আর্মেনিয়ার ইয়েরেভানে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জীববৈচিত্র্য বিষয়ক সিওপি-১৭ এর মতো আর্ন্তজাতিক সামিটগুলোর প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেন, যেখানে রাজনৈতিক অগ্রাধিকার নির্ধারিত হয়। তবে তিনি স্পষ্ট করে মনে করিয়ে দেন যে, আন্তর্জাতিক সভার সিদ্ধান্ত আসার অপেক্ষায় বৈজ্ঞানিক সরেজমিন কাজ থমকে থাকতে পারে না। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আমরা বসে থাকতে পারি না এবং সমুদ্রের বিজ্ঞানও আমাদের সেই শিক্ষাই দিচ্ছে। এই জরুরি পরিস্থিতিতে আমাদের তাত্ক্ষণিক পদক্ষেপ নিতে হবে; কারণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য রাজনীতিবিদেরা কখনো কখনো কয়েক দশক সময় লাগিয়ে দেন, যা শোনার জন্য প্রকৃতির কোনো সময় নেই।
সামুদ্রিক পরিবেশ সুরক্ষার ইতিহাসে মাদেইরা বরাবরই বিশ্বমঞ্চে এক অগ্রগামী নাম হিসেবে পরিচিত। এই ভূখণ্ডটিতে রয়েছে মূল মাদেইরা দ্বীপ, জনপ্রিয় সৈকত পোরতো সান্তো, দেসারতাস দ্বীপপুঞ্জ এবং দূরবর্তী সেলভাগেন্স দ্বীপপুঞ্জ। প্রায় আধ শতাব্দী আগে ১৯৭১ সালে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কোরি’স শেয়ারওয়াটার্স নামক এক ধরণের সামুদ্রিক পাখির আবাসস্থল রক্ষায় সেলভাগেন্স দ্বীপপুঞ্জকে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছিল। পরবর্তীকালে ২০২২ সালে এটি সম্প্রসারিত করা হলে পুরো সংরক্ষিত এলাকাটি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২,৬০০ বর্গকিলোমিটারে, যা বর্তমানে সমগ্র উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের বৃহত্তম সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা (হিসেবে স্বীকৃত।
এর পাশাপাশি ১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে দেসারতাস দ্বীপপুঞ্জের চারপাশে গড়ে তোলা সংরক্ষিত অঞ্চলটি এক অবিশ্বাস্য সাফল্য এনে দেয়। বিলুপ্তির আশঙ্কায় থাকা ইউরোপের অন্যতম বিপন্ন সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী মেডিটেরিয়ান মঙ্ক সিলদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় গড়ে উঠেছিল এই দ্বীপে। সুরক্ষা চালুর সময় ওই এলাকায় মাত্র ৮টি মঙ্ক সিল টিকে ছিল, যা ধারাবাহিক মেরিন প্রটেকশনের সুবাদে বর্তমানে বৃদ্ধি পেয়ে ৩১টিতে উন্নীত হয়েছে। এই বাস্তব প্রমাণই গবেষকদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিচ্ছে যে, সঠিকভাবে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হলে মহাসাগর তার হারানো জীবনকে আবার নতুন করে ফিরিয়ে আনতে পারে।
সূত্র: ইউরো নিউজ





