সবকিছু মনে রাখা কি জরুরি
এ কথা আমরা প্রায়ই শুনে থাকি, বয়স একটা সংখ্যামাত্র। মনের দিক থেকে যদি তরুণ থাকা যায় তাহলে বয়স কোনো ফ্যাক্টর নয়! কথাটি অনেকাংশে সঠিক। আবার চাইলেও আমরা সব সময় আমাদের বুড়িয়ে যাওয়া ঠেকাতে পারি না। কালের পরিক্রমায় বয়স বাড়ে, পরিবর্তন হয় আশপাশের।

ড. ইউসুফ খান
এ কথা আমরা প্রায়ই শুনে থাকি, বয়স একটা সংখ্যামাত্র। মনের দিক থেকে যদি তরুণ থাকা যায় তাহলে বয়স কোনো ফ্যাক্টর নয়! কথাটি অনেকাংশে সঠিক। আবার চাইলেও আমরা সব সময় আমাদের বুড়িয়ে যাওয়া ঠেকাতে পারি না। কালের পরিক্রমায় বয়স বাড়ে, পরিবর্তন হয় আশপাশের। টগবগে তরুণও একসময় প্রবীণ হয়। আমাদের জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা অনুযায়ী ৬০ বছরের ওপর যাঁদের বয়স, তাঁরাই প্রবীণ হিসেবে অভিহিত। কিন্তু কেউ কেউ আরও বেশি দিন পর্যন্ত মনে তারুণ্য ধরে রাখতে পারেন। মনের তারুণ্য যখন একটু একটু করে ক্ষয় হতে থাকে, তখনই দেখা দেয় বার্ধক্য। কমে আসতে থাকে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা।
২. মস্তিষ্কে তথ্য ধারণ করে রাখার প্রক্রিয়া কিংবা মস্তিষ্কে ধারণকৃত তথ্যকে স্মৃতি বলে। এই প্রক্রিয়ায় প্রথমে তথ্য আহরণ করে মস্তিষ্কে জমা করা হয় এবং দরকার অনুযায়ী ধারণকৃত সেই তথ্যভান্ডার থেকে খুঁজে আনা হয়। জমা করা তথ্য হারিয়ে গেলে কিংবা সময়মতো খুঁজে পাওয়া না গেলে তা দুর্বল স্মৃতিশক্তির লক্ষণ। আর এজন্যই স্মৃতিশক্তি মানুষের জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ। দৈনন্দিন কাজ থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই স্মৃতিশক্তির প্রয়োজন হয়। সাধারণত মধ্য বয়সের পর থেকে মানুষের স্মৃতিশক্তি কমতে শুরু করে।
৩. আমরা কী কাজের চাপে প্রায়ই এটা-সেটা ভুলে যাচ্ছি? আমাদের স্মৃতিশক্তি কী দুর্বল হয়ে পড়ছে? আমরা কেন ভুলে যাচ্ছি বা ভুলে যাওয়ার কারণই বা কী-এরকম প্রশ্ন নানা সময় মাথায় উঁকি দেয়। ভুলে যাওয়ার অনেক কারণ রয়েছে। ভুলে যাওয়াও কিন্তু একটি রোগ, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ডিমেনশিয়া বলে। ডিমেনশিয়া মস্তিষ্কের ক্ষয়জনিত রোগ। এ রোগে মানুষের ভিতরে চিন্তার ক্ষমতা, আচরণ, ব্যক্তিত্ব এবং ভুলে যাওয়ার লক্ষণ দেখা যায়। প্রফেসর ড. পল রেবর মনে করেন সাম্প্রতিক জীবনের স্ট্রেস এ রোগের একটি অন্যতম কারণ।
৪. রাস্তাঘাটে খুব পরিচিত কিংবা আত্মীয়স্বজন কারও সঙ্গে দেখা হলে কথা বলতে বলতে হঠাৎ খেয়াল হলো যার সঙ্গে কথা বলছি তার নামটাই তো মনে নেই! বাজারের ফর্দ বা সংসারের খরচ এমনকি সহজ হিসাবও কেমন যেন মাঝেমধ্যে গুলিয়ে যাচ্ছে। কথাবার্তায় দেখা দিচ্ছে অসংলগ্নতা। অথচ বহু বছর আগের কোনো ঘটনা নিখুঁতভাবে মনে পড়ছে। সকালে কী খেলাম তা মনে পড়ছে না। প্রিয় কারও জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী এসব কিন্তু মনে পড়ছে সেসব দিন পেরিয়ে যাওয়ার অনেক পরে। এটাই হলো ডিমেনশিয়া। ভুলে যাওয়াটা মানুষের একটি সহজাত প্রবৃত্তি। মানুষমাত্রই ভুলে যাবে। তবে ভুলে যাওয়াটা যেন অস্বাভাবিক না হয়।
৫. ভুলে যাওয়ার কয়েকটি বাস্তব ঘটনা তুলে ধরছি। বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের এক সহকর্মী একদিন তাঁর কাছে টেলিফোন নম্বরটা চাইলেন। আইনস্টাইন কিছুক্ষণ ভাবলেন। নিজের নম্বরটা কিছুতেই মনে করতে পারছিলেন না। তখন ভিতর থেকে নিয়ে এলেন একটি টেলিফোন ডাইরেক্টরি। তারপর বসে বসে নম্বর খুঁজতে শুরু করলেন। সহকর্মী বললেন, আমি তো আপনার নম্বরটা চেয়েছি। আইনস্টাইন বললেন, সেটাই তো খুঁজছি। সহকর্মী তো ভীষণ অবাক, নিজের টেলিফোন নম্বরটাও মনে নেই।
৬. আমি নিজেও মানুষের নাম এবং টেলিফোন নম্বর এ দুটো জিনিস মনে রাখতে পারি না। এজন্য আমাকে প্রায়ই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। দেখা গেল কোনো একজনের সঙ্গে আমার খুব সখ্য গড়ে উঠল। তারপর কিছুদিন দেখাসাক্ষাৎ নেই। পরে যখন হঠাৎ কোথাও দেখা হলো তখন মনে হলো, আরে ওনাকে তো চিনি! কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছি না কোথায় দেখেছি। পেটে আসছে কিন্তু মুখে আসছে না। বুঝতেও দিচ্ছি না যে তার নাম ভুলে গেছি। অথচ কথা চালিয়ে যাচ্ছি। কি যে একটা অবস্থা! মাঝেমধ্যে ভান করছি যে হ্যাঁ, হ্যাঁ আপনাকে তো চিনি, নামও জানি। আসলে তো কিছুই মনে করতে পারছি না। তখন বাধ্য হয়ে জিজ্ঞাসা করি, ভাই আপনার পুরো নামটা যেন কী? ভাবখানা এমন যেন ডাকনামটা মনে আছে এখন পুরো নামটা জানতে চাচ্ছি। চালাক লোকেরা আবার ব্যাপারটা ধরে ফেলে। তখন লজ্জায় লাল হয়ে বলি, স্যরি ব্রাদার, অনেক দিন পরে দেখা হলো তো তাই অতটা খেয়াল নেই। সত্যি কথা বলতে কী আমার অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মনে রাখতে পারি না, এটিও তার মধ্যে একটি।
৭. মার্কিন ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সে দেশটির প্রেসিডেন্ট হওয়ার রেকর্ড গড়েন জো বাইডেন। ২০২০ সালে যখন তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন তখন তাঁর বয়স ছিল ৭৭ বছর। তিনি যখন দ্বিতীয়বার দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচন প্রার্থিতার আগ্রহ প্রকাশ করেন, তখন তাঁর বয়স দাঁড়ায় ৮১ বছর। মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে প্রার্থিতা করার আইনগত এখতিয়ার রাখেন; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বিরোধী দল রিপাবলিকান পার্টির পাশাপাশি বাইডেনের নিজ দল ডেমোক্রেটিক পার্টির একাংশ দীর্ঘদিন ধরে প্রচার করে আসছিল, বয়সজনিত কারণে বাইডেন স্মৃতিভ্রংশ সমস্যায় ভুগছেন। এ কারণে আসন্ন নির্বাচনে তাঁর প্রার্থী হওয়া উচিত হবে না। তাঁর বড় ছেলে ও আইনজীবী বিউ বাইডেনের যখন মৃত্যু হয়, তখনো যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্টের পদে ছিলেন তিনি। ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ২০১৫ সালে মারা যান বিউ। বয়সজনিত কারণে বাইডেনের স্মৃতিশক্তি এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ে যে তিনি কবে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং কোন বছর তাঁর বড় ছেলে মারা গেছে, তার সঠিক উত্তর দিতে পারেননি। আর এসব কারণেই তিনি দ্বিতীয়বার মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান। আর তখনই ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হন। মানুষমাত্রই কমবেশি অনেক কিছু ভুলে যায়। কিন্তু এই ভুলে যাওয়া যদি মাত্রাতিরিক্ত হয়, তখন দৈনন্দিন জীবনকে দুরূহ করে তোলে। জো বাইডেনের ক্ষেত্রেও হয়তো তাই ঘটেছিল।
৮. মানবদেহের সবচেয়ে কার্যকরী অঙ্গ মস্তিষ্ক। আমাদের হাঁটা-চলাফেরা, যোগাযোগ, আবেগ প্রকাশ, সিদ্ধান্ত নেওয়া-সব দায়িত্ব পালন করে মস্তিষ্ক। প্রয়োজনে দীর্ঘদিন আগের কোনো ঘটনা কিংবা স্মৃতিচারণা করতে মস্তিষ্ক মুহূর্তেই চলে যায় অতীতে। আবার অনেক ক্ষেত্রে খুব কাছের কোনো ঘটনা হুট করে হারিয়ে যায় স্মৃতির ভান্ডার থেকে। বছরের পর বছর অনেক কিছু স্মৃতিতে ধারণ করে রাখা কিংবা ভুলে যাওয়া-কোনটা ভালো এ নিয়ে সবার মনেই প্রশ্ন থাকে।
৯. কিছু কিছু জিনিস ভুলে যাওয়া কি আসলেই উপকারী? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চেষ্টা করেছেন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক চরন রঙ্গনাথ। তিনি একজন বিখ্যাত স্নায়ুবিশেষজ্ঞ। ৩০ বছর ধরে স্মৃতিশক্তি এবং ভুলে যাওয়ার কারণগুলো নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি মনে করেন, ভুলে যাওয়া মস্তিষ্কের জন্য খুবই উপকারী, কারণ এটি মস্তিষ্ককে অপ্রয়োজনীয় তথ্য মুছে ফেলে নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মনে রাখতে সাহায্য করে। এটি মানসিক চাপ কমায়, সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ করে এবং সৃজনশীলতা বৃদ্ধি করে।
১০. স্নায়ুবিজ্ঞানী রঙ্গনাথ তাঁর নতুন গ্রন্থ ‘হোয়াই উই রিমেম্বার’-এ বলেছেন, আমাদের অনেকেই স্মৃতি হাতড়াতে গিয়ে কোনো তথ্য না পেয়ে হতাশ হন। এতে দোষের কিছু নেই বরং ভুলে যাওয়াটাই স্বাভাবিক, যা আমাদের জন্য উপকারী। ধরা যাক, আমি আমার এক বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছি। কথা প্রসঙ্গে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি কেন সব জিনিস জমিয়ে রাখ না? সবকিছু কেন সংরক্ষণ কর না? উত্তরে বন্ধু জানালেন, সব যদি জমিয়ে রাখতাম, তাহলে তো ঘর জঞ্জালে ভরে যেত। তেমনি আমরা যদি কোনো কিছুই না ভুলতাম, তাহলে স্মৃতির স্তূপ জমে যেত। যখন যে তথ্যটি প্রয়োজন, তখন সেটি কখনোই খুঁজে পেতাম না।
১১. স্নায়ুবিদ তাঁর গ্রন্থে আরও বলেছেন, ধরুন আপনি কোথাও ঘুরতে গিয়ে একটা হোটেলে উঠলেন। দুই দিন থেকে ফিরে এলেন। দুই সপ্তাহ পর ওই হোটেলের রুম নম্বর মনে রাখাটি কি খুব প্রয়োজন? অর্থাৎ এটা কোনো অর্থ বহন করে না। একইভাবে, রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া হাজারো মানুষের কথা ভাবুন। তাদের সবার মুখ মনে রাখার প্রয়োজন আছে কি?
১১. নিজের লেখা ‘হোয়াই উই রিমেম্বার’ গ্রন্থটি সম্পর্কে লিখতে গিয়ে স্নায়ুবিজ্ঞানী রঙ্গনাথ বলেছেন, আমি আমার স্মৃতি সংরক্ষণ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শিখেছি। নিজের স্মৃতি সংরক্ষণের ব্যাপারে এটি আমাকে উৎসাহ জুগিয়েছে। আমি এখন নিয়মিত ব্যায়াম করার চেষ্টা করছি। খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে অনেক সচেতন হয়েছি, যাতে বৃদ্ধ বয়সে আমার মস্তিষ্ক সুস্থ থাকে এবং মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে। শরীরচর্চা স্নায়ুর কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করে এবং সেই সঙ্গে তেল-মসলা এড়িয়ে শাকসবজি খাওয়ার ওপরও তিনি জোর দিয়েছেন।
১২. রঙ্গনাথ তাঁর গ্রন্থটিতে আরও উল্লেখ করেছেন, স্মৃতিশক্তিকে মজবুত রাখার জন্য পর্যাপ্ত ঘুম খুবই জরুরি। ঘুম না হলে মস্তিষ্ক আরও বেশি বুড়িয়ে যেতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ বৃদ্ধি করে, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, হার্ট ভালো রাখে এবং মেজাজ স্থিতিশীল রেখে মানসিক চাপ কমায়। তাই তো পর্যাপ্ত ঘুম বিলাসিতা নয়, বরং সুস্থ জীবনের একটি অন্যতম প্রয়োজনীয় উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।





