হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা : সামনে কী ঘটতে যাচ্ছে?
ইরানের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে দেশটির কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ইরানি বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদ লক্ষ্য করে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করছিল।

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে দেশটির কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ইরানি বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদ লক্ষ্য করে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করছিল। এর জবাবে ‘প্রতিরক্ষামূলক’পদক্ষেপ হিসেবে সীমিত হামলা চালানো হয়েছে। তবে এ ঘটনায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আট মাসের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাত আবারও বড় আকারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের কয়েক ঘণ্টা আগে মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) এ হামলার ঘটনা ঘটে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির কেশম ও হেঙ্গাম দ্বীপ এবং কাছের মূল ভূখণ্ডের বন্দর আব্বাস এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা ইরানিদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। তবে হামলার বিস্তারিত বা ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়ে আসছিলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর কথা বিবেচনা করছেন তিনি। এর মধ্যেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে আবারও সামরিক অভিযান শুরুর অনুরোধ জানিয়েছেন বলে জানিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যের দুই কর্মকর্তা ও এ বিষয়ে অবগত আরেক ব্যক্তি।
এদিকে যুদ্ধের বিস্তার ঠেকাতে কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি মিত্র দেশ ওয়াশিংটনকে নতুন করে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু না করার আহ্বান জানিয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সোমবার বলেন, ট্রাম্প ও তিনি ইরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী।
এপি জানায়, গত সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে সর্বশেষ ইরানে হামলা চালিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন। তবে ইরানের তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে বাধা দিতে দেশটির উপকূলীয় জলসীমায় এখনো হাজার হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছে। পাশাপাশি আরেকটি বিমানবাহী রণতরি ও অতিরিক্ত কয়েক হাজার সেনা মধ্যপ্রাচ্যের পথে রয়েছে। ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের শর্ত পূরণ করলে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া এবং পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরুর বিষয়ে তারা প্রস্তুত। তেহরানের শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে- ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া, ইরানি তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং লেবাননসহ সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের শর্তগুলো মেনে না নেওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খুলবে না। অন্যদিকে ইরানের প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, যুদ্ধ এড়ানোর দায়িত্ব এখন যুক্তরাষ্ট্রের। তবে ওয়াশিংটনের কাছে ইরানের পক্ষ থেকে কী জবাব দেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট করেননি তিনি। ইরানের সশস্ত্র বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে বলেও জানান গালিবাফ।
এপি জানিয়েছে, নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের মধ্যে সাম্প্রতিক ফোনালাপে মার্কিন নির্বাচনের পর ইরানে নতুন দফায় হামলার বিষয়টি উঠে আসে। তবে মধ্যস্থতাকারীরা এমন একটি কাঠামো তৈরির চেষ্টা করছেন, যাতে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের হামলা বন্ধের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে নৌ অবরোধ তুলে নেবে। এ সপ্তাহেই এ বিষয়ে আরও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসিও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনায় বসে সমঝোতায় পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছেন। আঞ্চলিক সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি এড়াতে সামরিক উত্তেজনা না বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে শান্তিকালে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। ফলে এ নৌপথে অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। আট মাসের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধ ইতিমধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করেছে এবং ইরানের অর্থনীতিতেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পরও দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। তবে একদিকে নতুন সামরিক অভিযানের হুমকি, অন্যদিকে আলোচনার চেষ্টা- দুই বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে হরমুজ প্রণালি ও পুরো মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
তথ্য সূত্র- এপি।





