১০ বছর ধরে কচ্ছপগতিতে চলছে জবির দ্বিতীয় ক্যাম্পাস নির্মাণ
পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি পরিবেশ ও যানজটের মধ্যে দুই দশক ধরে উচ্চশিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি)। বিসিএস, ব্যাংক-বিমা, জুডিশিয়ারি, আইন, পুলিশ প্রশাসন, করপোরেট ও বহুজাতিক কোম্পানিতে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা নিজেদের অবস্থান তৈরি করছেন।

মুক্ততথ্য ডেস্ক
পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি পরিবেশ ও যানজটের মধ্যে দুই দশক ধরে উচ্চশিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি)। বিসিএস, ব্যাংক-বিমা, জুডিশিয়ারি, আইন, পুলিশ প্রশাসন, করপোরেট ও বহুজাতিক কোম্পানিতে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা নিজেদের অবস্থান তৈরি করছেন। তবে একাডেমিক পরিধি ও অর্জন বাড়লেও দুই দশকে কাটেনি আবাসন, গবেষণা, অবকাঠামো, খেলার মাঠ, শ্রেণিকক্ষ, খাবার ও যাতায়াতসংকট। প্রায় ১৯ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে আবাসিক আসন ১০ শতাংশের কম। মাত্র সাড়ে ৭ একরের মূল ক্যাম্পাসে চলছে সাত অনুষদ, ৩৮ বিভাগ ও দুটি ইনস্টিটিউটের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম। শিক্ষক রয়েছেন ৭৩২ জন। ফলে শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার, খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত জায়গার সংকট দীর্ঘদিনের।
দেড় শতকের পথ পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় : ১৮৫৮ সালে ‘ঢাকা ব্রাহ্ম স্কুল’ হিসেবে যাত্রা করা প্রতিষ্ঠানটির নাম ১৮৭২ সালে ‘জগন্নাথ স্কুল’ এবং ১৮৮৪ সালে ‘জগন্নাথ কলেজ’ করা হয়। ১৯০৮ সালে প্রথম শ্রেণির কলেজে উন্নীত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর স্নাতক কার্যক্রম বন্ধ হলেও ১৯৪৯ সালে তা ফের চালু হয়। ২০০৫ সালের ২০ অক্টোবর জাতীয় সংসদে গৃহীত ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সংকটআইন, ২০০৫’-এর মাধ্যমে জগন্নাথ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। স্বাধীনতা ও আন্দোলন-সংগ্রামের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাস। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ পাকিস্তানি সেনারা কলেজে হামলা চালিয়ে সেখানে ক্যাম্প স্থাপন করে। মুক্তিযুদ্ধে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনেকে অংশ নেন; কয়েকজন শহীদ হন। যুদ্ধের পর ক্যাম্পাসে গণকবর ও কয়েক ট্রাক মানবকঙ্কাল উদ্ধারের তথ্য রয়েছে। ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে জবির ইকরামুল হক সাজিদ ও আহসান হাবিব তামিম শহীদ হন।
আবাসন সবচেয়ে বড় সংকট : ছাত্রীদের জন্য প্রায় ১ হাজার ২০০ আসনের একটি ১৬ তলা হল রয়েছে। কেরানীগঞ্জে আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের ‘মেধাবী’ প্রকল্পে অস্থায়ীভাবে ৬০০ থেকে ৭০০ শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা হয়েছে। এ ছাড়া তৎকালীন জগন্নাথ কলেজের দখল হয়ে যাওয়া ডা. হাবিবুর রহমান ও বাণীভবন হল উদ্ধার করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে কাজ চলছে। তবু অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে মেস বা বাসায় থাকতে হয়। পুরান ঢাকার বাড়তি ভাড়া, যানজট ও ঘনবসতিতে ভোগান্তি বাড়ছে।
দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের অপেক্ষা : সংকট সমাধানে কেরানীগঞ্জের তেঘুরিয়ায় প্রায় ২০০ একর জমিতে দ্বিতীয় ক্যাম্পাস নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয়। ২০১৮ সালে কাজ শুরু হলেও এখনো কাক্সিক্ষত গতিতে এগোয়নি।
এক ক্যাফেটেরিয়ায় হাজারো শিক্ষার্থী : বিপুল শিক্ষার্থীর জন্য প্রধান ক্যাফেটেরিয়ায়ই বড় খাবারের ব্যবস্থা। দুপুরে চাপ বাড়লে খাবার দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়া, মান ও পরিমাণ নিয়ে অসন্তোষ এবং বসার জায়গার সংকট দেখা দেয়। সম্প্রতি রান্নাঘরের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের ছবি সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি আলোচনায় আসে।
গবেষণা, মাঠ ও পরিবহনেও সংকট : এমফিল ও পিএইচডি কার্যক্রম থাকলেও আধুনিক গবেষণাগার, অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও গবেষণার পরিবেশের ঘাটতি রয়েছে। ধূপখোলা কেন্দ্রীয় মাঠ ক্যাম্পাস থেকে দূরে হওয়ায় নিয়মিত ব্যবহারের সুযোগ সীমিত। নিজস্ব বাস, মাইক্রোবাস, বিআরটিসির ভাড়া করা বাসসহ ৫৭টি যানবাহন থাকলেও আবাসনসংকটের কারণে ক্যাম্পাসের বাইরে থাকা শিক্ষার্থীর ২০ শতাংশও এসব পরিবহনে যাতায়াতের সুযোগ পান না।
যা বলছেন উপাচার্য : উপাচার্য অধ্যাপক মো. রইছ উদদীন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত। আবাসন শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় যৌক্তিক সমস্যা, যা এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। অতিরিক্ত নিয়োগের কারণে শিক্ষার পাশাপাশি যথাযথ গবেষণাও হয়নি। ২০১৮ সালে দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ শুরু হলেও তা কাক্সিক্ষত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।’ দায়িত্ব নেওয়ার পর দুটি হলের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রথমবারের মতো “ভাইস চ্যান্সেলর অ্যাওয়ার্ড”, “ডিনস অ্যাওয়ার্ড” ও “স্পেশাল রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড” দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী ৩০ জানুয়ারি দ্বিতীয় সমাবর্তনের প্রস্তুতিও চলছে।’ তাঁর ভাষায়, ‘একেবারে শূন্য থেকে শুরু করেছি। সরকারের সুদৃষ্টি পেলে সংকট কাটিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।’





